
নিজস্ব প্রতিবেদক.
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সরকারের এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতির কাছে চিঠি পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পক্ষের কাছে তিনজন করে সম্ভাব্য সদস্যের নাম চেয়েছে মন্ত্রণালয়।
বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসের শুরুতেই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, অক্টোবরের মধ্যেই বোর্ড গঠনের কাজ সম্পন্ন হতে পারে।
## শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ
মজুরি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীর উত্তরায় কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের টানা তিন দিনের আন্দোলন পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। গত বুধবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে একাধিক কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আজমপুর এলাকায় সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যেই মজুরি বোর্ডের সদস্য মনোনয়নের জন্য চিঠি পাঠানোর বিষয়টি সামনে আসে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ডে একজন নিরপেক্ষ সদস্য, একজন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং একজন শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, তাঁরা মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছেন। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রতিনিধিদের নাম চূড়ান্ত করে পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, সরকার শুরু থেকেই মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে ইতিবাচক। তবে তাঁর দাবি, একটি গোষ্ঠী আন্দোলনের মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে, যা সাধারণ শ্রমিকদের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ জানান, মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের নাম সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের। শ্রমিকপক্ষের নাম প্রস্তাব করবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। চিঠিতে নাম জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না থাকলেও দ্রুত নাম পাঠাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। দুর্গাপূজার ছুটির আগেই নাম পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
## তিন বছর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণের সুযোগ
শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে, যা ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। সে হিসাবে আগামী নভেম্বরে বর্তমান মজুরিকাঠামোর তিন বছর পূর্ণ হবে।
২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই সময় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই সঙ্গে সাতটি গ্রেড কমিয়ে মজুরিকাঠামো পাঁচটি গ্রেডে আনা হয়।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বর্তমান মজুরি দিয়ে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ বাড়লেও আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।
গত বুধবার গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকায় যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যেত, ২০২৬ সালে তা কিনতে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হচ্ছে।
তাঁদের মতে, পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে অনেক শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে। তারপরও জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
## মজুরি বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি চান নেতারা
নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের স্বার্থ যথাযথভাবে তুলে ধরতে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, অতীতে মজুরি বোর্ডে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি থাকলেও তাঁদের মূল্যায়নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মালিকদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। এবার বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি নিরপেক্ষ সদস্য নির্বাচনে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি জানান তিনি।
তাসলিমা আখতারের মতে, নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনমান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং উৎপাদনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হলে শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরিকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।
## নতুন মজুরি কত হবে, নজর শ্রমিকদের
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগে পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে বোর্ড গঠন, প্রতিনিধিদের মনোনয়ন এবং আলোচনার পর নতুন মজুরির পরিমাণ চূড়ান্ত হবে।
এখন দেখার বিষয়, নতুন বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত হয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কী ধরনের মজুরিকাঠামো নির্ধারণ করা হয়। শ্রমিকদের প্রত্যাশা, নতুন সিদ্ধান্তে তাঁদের আয় ও জীবনমানের বাস্তব উন্নতির প্রতিফলন থাকবে।