
অনলাইন ডেস্ক নিউজ,
বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পের ‘বালিশ কেলেঙ্কারি’র ঘটনা অর্ধযুগ পার হতে চললেও এর তদন্ত শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৯ সালে এই দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং দুদক তদন্তে নামলেও আজও তা চূড়ান্ত পরিণতি পায়নি। দীর্ঘ এই সময়ে তিনটি কমিশন বদল হলেও তদন্তের ভাগ্য ঝুলেই রয়েছে, যা সংস্থাটির কার্যকরিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কেলেঙ্কারির সূত্রপাত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী কেনাকাটায় অবিশ্বাস্য দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসে। প্রতিটি বালিশ ৫ হাজার ৯৫৭ টাকায় কেনা এবং তা ফ্ল্যাটে ওঠাতে ৭৬০ টাকা খরচ দেখানো হয়।এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং এটি ‘বালিশ কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায়। দুদকের প্রাথমিক পদক্ষেপ ও দীর্ঘসূত্রিতা, ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দুদক গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে চারটি মামলা দায়ের করে। তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও অর্ধযুগেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দীর্ঘসূত্রিতার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি।জানা গেছে, এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে, যা তদন্তের ধারাবাহিকতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।বার নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের পর তাকে নতুন করে সব কিছু শুরু করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষিত, তদন্তে ধীরগতির কারণে ২০২০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে ছয় মাসের মধ্যে এই কেলেঙ্কারির তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার বহু বছর পরও দুদক তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারেনি।এটি আদালতের নির্দেশনাকে সরাসরি উপেক্ষা করার সামিল বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ও দুদকের সীমাবদ্ধতা, অনেকের মতে, এই তদন্ত শেষ না হওয়ার পেছনে অদৃশ্য কোনো কারণ বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। তৎকালীন সরকারের সাথে এই কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।দুদকের সাবেক কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, কমিশনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং আগের অনেক দুর্নীতির মামলাও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে।তবে রূপপুরের মতো একটি আলোচিত ঘটনার তদন্ত শেষ করতে না পারার দায় বর্তমান কমিশনও এড়াতে পারে না বলে তারা মনে করেন। বর্তমান অবস্থা, বর্তমানে এই মামলার আসামিরা সবাই জামিনে রয়েছেন। তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, যা হতাশাজনক। সার্বিকভাবে, রূপপুর বালিশ কেলেঙ্কারির তদন্তে দুদকের ব্যর্থতা সংস্থাটির সক্ষমতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বারবার পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রভাবের গুঞ্জন এবং দুদকের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা—এই ত্রিবিধ কারণেই সম্ভবত অর্ধযুগেও এই আলোচিত কেলেঙ্কারির তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি।