
ডেস্ক নিউজ,
রাজধানীর উত্তরা এলাকায় র্যাব পরিচয়ে সংঘটিত কোটি টাকা ডাকাতির চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।রাজধানীর উত্তরা এলাকায় নগদ কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরের কাছ থেকে র্যাব পরিচয়ে এক কোটি আট লক্ষ ১১ হাজার টাকা ডাকাতির চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং নগদ ২২ লক্ষ ১০ হাজার ৭৮০ টাকা, ব্যাংকে গচ্ছিত ১২ লক্ষ টাকা ও হাইয়েস গাড়িসহ দুর্ধর্ষ ডাকাত চক্রটির পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) এবং উত্তরা বিভাগ ও উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো- ১। মোঃ হাসান (৩৫) ২। গোলাম মোস্তফা ওরফে শাহিন (৫০) ৩। শেখ মোঃ জালাল উদ্দিন ওরফে রবিউল (৪৩) ৪। মোঃ ইমদাদুল শরীফ (২৮) ও ৫। মোঃ সাইফুল ইসলাম ওরফে শিপন (২৭) তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার (১৮ জুন ২০২৫ খ্রি.) রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃতরা একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের সদস্য, যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেজে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও লুটপাট করে আসছিল। সম্প্রতি তারা উত্তরা এলাকার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে লক্ষ্য করে র্যাবের পোশাক ও পরিচয় ব্যবহার করে অপারেশন চালিয়ে একটি বড় অঙ্কের নগদ টাকা লুট করে। ডিএমপি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “আমরা গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় এই ডাকাতির ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছি। তাদের কাছ থেকে লুট করা অর্থের একটি বড় অংশ এবং ব্যবহৃত গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। তদন্ত এখনও চলমান, এবং আমরা বিশ্বাস করি চক্রের আরও সদস্যকে শিগগিরই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।” উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন ২০২৫ খ্রি. সকাল আনুমানিক ৮:৫৫ ঘটিকায় নগদের ডিস্ট্রিবিউটর জনৈক আব্দুল খালেক নয়ন তার উত্তরার ১২ নং রোডের ৩৭ নং বাসা থেকে প্রতিষ্ঠানের চারজন কর্মচারীসহ চারটি ব্যাগে এক কোটি আট লক্ষ ১১ হাজার টাকা নিয়ে দুটি মোটরসাইকেল যোগে উত্তরার নগদের অফিসের উদ্দেশে রওনা হয়। পথিমধ্যে উত্তরা ১২ ও ১৩ নং রোডের সংযোগস্থলে একটি কালো রঙের হাইয়েস মাইক্রোবাস তাদের গতিরোধ করে। মাইক্রোবাস থেকে ‘র্যাব’ লেখা কালো কটি পরিহিত মুখে কালো কাপড় বাঁধা ৬/৭ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি হাতে অস্ত্র নিয়ে নামে। তাদের কাছে আসতে দেখে নগদের টাকা বহনকারী কর্মচারীরা টাকার ব্যাগ নিয়ে দৌঁড়ানোর চেষ্টা করে। তখন দুষ্কৃতকারীরা তাদের ধাওয়া করে চারটি ব্যাগে থাকা টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের তিনজনকে মাইক্রোবাসে তুলে হাত-চোখ বেঁধে মারধর করে। ঘটনাস্থল থেকে একজন কর্মচারী পালাতে সক্ষম হন। পরে ডাকাতরা তিনজনকে তুরাগ থানার ১৭ নং সেক্টরের বৃন্দাবন এলাকায় ফেলে রেখে টাকা, দুটি অফিসিয়াল মোবাইল ফোন ও তিনটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আব্দুর রহমানের অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়। তিনি আরও জানান, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং তারা পূর্বেও একই ধরনের অপকর্মে জড়িত ছিল। এ ঘটনায় উত্তরা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডিএমপি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষকে এ ধরনের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযান জোরদার করা হবে।থানা সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর উত্তরা বিভাগ ও ডিবি ঘটনার রহস্য উদঘাটন, আসামি গ্রেফতার ও লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারে তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করে। উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এর নেতৃত্বে উত্তরা বিভাগের এডিসি, এসি, অফিসার ইনচার্জসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি চৌকস দল তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনায় ব্যবহৃত মাইক্রোবাস ও চালককে সনাক্ত করে। অতঃপর বুধবার (১৮ জুন ২০২৫ খ্রি.) রাত আনুমানিক ১:৪৫ ঘটিকায় খিলগাঁও থানা এলাকা থেকে মাইক্রোবাসের চালক মোঃ হাসানকে গ্রেফতার করে উত্তরা পশ্চিম থানার একটি টিম। এ সময় তার হেফাজত হতে নকল একটি নেমপ্লেট ও নগদ আট হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। অতঃপর গ্রেফতারকৃত হাসানের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সবুজবাগ থানার মাদারটেক চৌরাস্তার স্বপন মিয়ার গ্যারেজ থেকে উক্ত ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি জব্দ করা হয়।
ডিবি উত্তরা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ডিবি উত্তরা বিভাগের একটি টিম ঘটনাস্থলসহ আশেপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে। পরবর্তীতে উক্ত ডাকাত চক্রের মূলহোতা গোলাম মোস্তফা ঘরামী ওরফে শাহিনকে বুধবার (১৮ জুন ২০২৫ খ্রি.) রাত আনুমানিক ১০:৪০ ঘটিকায় ঢাকার উত্তরা এলাকা হতে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে লুণ্ঠিত তের লক্ষ চৌত্রিশ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। অতঃপর গ্রেফতারকৃত শাহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোঃ ইমদাদুল শরীফকে রাত আনুমানিক ১১:৫০ ঘটিকায় আদাবর থানাধীন বায়তুল আমান হাউজিং এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয। এ সময় তার নিকট হতে লুষ্ঠিত আট লক্ষ চার হাজার ৭৮০ টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত শাহিন ও শরীফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট শেখ মোঃ জালাল উদ্দিনকে একই দিন রাতে সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার নিকট হতে নগদ ৬৩ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত জালাল নিজেকে ক্যাপ্টেন জালাল হিসেবে নিজেকে পরিচয় প্রদান করে। জালাল ঘটনার পরদিন লুষ্ঠিত ১২ লক্ষ টাকা ঢাকা ব্যাংকের নিজ নামীয় একাউন্টে জমা করে। উক্ত টাকা জব্দের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।
ডিবি সূত্র আরও জানায়, পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাত চক্রের অপর সদস্য মোঃ সাইফুল ইসলাম ওরফে শিপনকে বুধবার রাতে এয়ারপোর্ট রেল স্টেশন এলাকা হতে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের হেফাজত হতে র্যাব ও পুলিশের নকল আইডি কার্ড, লাঠি, সিগনাল লাইট, সেনাবাহিনীর লোগো সম্বলিত মানিব্যাগ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। থানা ও ডিবি সূত্রে জানা যায়, ডাকাত দলের দলনেতা মোস্তফা ওরফে শাহিন একজন চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য এবং শেখ মোঃ জালাল উদ্দিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। এই দলটি দীর্ঘদিন ধরে র্যাব ও পুলিশের পরিচয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি করে আসছে মর্মে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন। মামলার নিবিড় তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং ঘটনায় জড়িত অন্যান্যদের গ্রেফতারসহ অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।